সোমবার ১০, আগস্ট ২০২৬

সোমবার ১০, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

খেলার মাঠ: কৃষক আর ফসলের শিল্পী সুলতান

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০২:২০ পিএম

2003

খেলার মাঠ: কৃষক আর ফসলের শিল্পী সুলতান

দৈনিক অদম্য বার্তা ডেস্ক: ঢাকা সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ || শ্রাবণ ২৬ ১৪৩৩ || ২৬ সফর ১৪৪৮ হিজরি

ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ

একজন কৃষক লাঙল হাতে মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তিনি আমাদের চেনা কৃষক নন। তাঁর বাহু এত মোটা যে মনে হয় পাথর কেটে বানানো। বুক যেন পাহাড়ের ঢাল। পিঠে এমন শক্তি, যেন তিনি একাই একটা জমি উল্টে দিতে পারেন। তাঁর পাশে একজন নারী—তিনিও অস্বাভাবিক শক্তিশালী। কেউ ধান কাটছে, কেউ বীজ বুনছে, কেউ গরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছে।

চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে—এ কেমন কৃষক? আর একটু তাকালে মনে হয়—আসলে এ কেমন মানুষ? এই প্রশ্নই এস এম সুলতানের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বেশি মনে হয়। কারণ সুলতান কৃষককে শুধু কৃষক হিসেবে আঁকেননি। তিনি তাঁদের মধ্যে দেখেছিলেন এমন এক শক্তি, যে শক্তি দিয়ে একটি দেশ বেঁচে থাকে।

এস এম সুলতানের জন্ম ১৯২৩ সালে নড়াইলে। তখন জায়গাটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত; আজকের বাংলাদেশ। তাঁর বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেয়াল, বাড়িঘর আর নির্মাণের দৃশ্য দেখে তাঁর আঁকার আগ্রহ তৈরি হয়। কয়লা দিয়ে আঁকতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু শিল্পী হওয়ার স্বপ্নের সামনে প্রথম বাধাই ছিল অর্থের অভাব। কলকাতায় যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক জমিদারের সহায়তায় ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতায় পৌঁছান।

সেখানে গিয়ে তাঁর সামনে আরেক দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে ঢোকার জন্য যে যোগ্যতা দরকার, সুলতানের তা ছিল না। কিন্তু ভাগ্য কখনো কখনো মানুষের পাশে দাঁড়ায়। কবি ও শিল্পসমালোচক হাসান শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁকে আশ্রয় দিলেন, নিজের লাইব্রেরি ব্যবহার করতে দিলেন এবং তাঁর সহায়তায় ১৯৪১ সালে সুলতান আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে পারলেন। তবে সুলতান ছিলেন এমন মানুষ নন, যিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়মের মধ্যে চিরকাল বসে থাকবেন। তিন বছর পর, ১৯৪৪ সালে, তিনি আর্ট স্কুল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। তারপর শুরু হলো তাঁর ভ্রমণ।

ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের প্রতিকৃতি এঁকে অর্থ উপার্জন করেছেন। ১৯৪৬ সালে শিমলায় তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী। দেশভাগের পর লাহোরে ১৯৪৮ সালে এবং করাচিতে ১৯৪৯ সালে আরো প্রদর্শনী। কিন্তু তাঁর জীবনের এই সময়ের ছবিগুলোর একটি আশ্চর্য পরিণতি—আজ সেগুলোর কোনোটি টিকে নেই। ছবি সংরক্ষণ করার ব্যাপারে সুলতানের নিজেরই খুব একটা আগ্রহ ছিল না।

এই জায়গায় এসে সুলতানের চরিত্রটি একটু বুঝতে সুবিধা হয়। তিনি প্রচলিত অর্থে ‘ক্যারিয়ার-সচেতন’ শিল্পী ছিলেন না। বরং ছিলেন এক ধরনের বোহেমিয়ানহ শিল্পী—ভ্রমণ করেছেন, নিজের ইচ্ছেমতো থেকেছেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম বা শিল্পবাজারের চাহিদাকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। তাঁর ব্যক্তিত্ব যেমন আলাদা ছিল, তাঁর শিল্পও তেমনই আলাদা। লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ কৃষি জীবন আর বাংলার সাধারণ মানুষ তাঁর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

এই সুলতানকে নিয়ে আহমদ ছফার একটি অসাধারণ মূল্যায়ন উদ্ধার করা সম্ভব হয় হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখা এস এম সুলতানের জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস ‘সুলতান’-এ। সেখানে ছফা বলছেন—“তিনি গতানুগতিকভাবে আর্ট কলেজের পরীক্ষায় পাস করে বের হননি। নিয়মিত ছবি এঁকে প্রর্শনী করেননি। কোথাও স্থায়ী ঠিকানা নেই তাঁর। চিরকুমার এই শিল্পী গৈরিক শাড়ি পরে, রাধা হয়ে বৈষ্ণবলীলার আধ্যাত্ম রসে মগ্ন থেকেছেন, নেশা করেছেন কসমিক রিয়েলিটির সত্য অনুভবের জন্য, মিশেছেন সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষদের সঙ্গে আপনজন হয়ে। তার ছবির বিষয় বড় বেশি গ্রাম্য। বক্তব্যে ইংগিতময়তা, দূর্বোধ্যতার পরিবর্তে আছে এক ধরনের সরলতা যা অশিক্ষিতের নামান্তর মনে সম্পন্ন হয়েছে। আদিম মানুষের মতো তার ছবির মানুষগুলি পরিচিত নয় যেন। সব মিলিয়ে সুলতান বাংলাদেশের তথা এই উপমহাদেশের চিত্রকলার ঐতিহ্যকে ঠাট্টা করেছেন এবং এক নতুন ঐতিহ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছেন।”

ছফার এই মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত অন্যত্র। সুলতানের ছবির বিষয় ছিল, তাঁর ভাষায়, ‘বড় বেশি গ্রাম্য’। তাঁর ছবির মানুষগুলোও যেন আমাদের চেনা বাস্তবতার মানুষ নয়। শরীর অস্বাভাবিকভাবে বড়, পেশি অতিরঞ্জিত, মুখাবয়ব অনেক সময় আদিমতার কাছাকাছি। আবার তাঁর শিল্পে আধুনিকতাবাদী দুর্বোধ্যতার বদলে আছে এক ধরনের সরলতা। কিন্তু এই সরলতাকে দুর্বলতা মনে করলে ভুল হবে। সরলতা কখনো কখনো সবচেয়ে কঠিন শিল্পভাষা।

সুলতানের ছবিতে কৃষককে কোনো তাত্ত্বিক জটিলতার আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়নি। কৃষক সরাসরি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার শরীর বিশাল, তার শ্রম দৃশ্যমান, তার শক্তি অস্বীকার করার উপায় নেই। এই জায়গাতেই আহমদ ছফার সেই তীক্ষ্ম মন্তব্যটি বিশেষ অর্থবহ হয়ে ওঠে—সুলতান যেন বাংলাদেশের, এমনকি এই উপমহাদেশের প্রচলিত চিত্রকলার ঐতিহ্যকেই এক অর্থে ‘ঠাট্টা’ করেছেন এবং তার জায়গায় ‘এক নতুন ঐতিহ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছেন।’

কথাটি ভাবনা জাগানিয়া। কারণ নতুন ঐতিহ্য তৈরি করতে গেলে সবসময় নতুন বিষয় আবিষ্কার করতে হয় না। কখনো কখনো পুরোনো, অবহেলিত বিষয়কেই এমনভাবে দেখতে হয়, যাতে সেটি আর আগের মতো না থাকে। সুলতান সেটাই করেছিলেন। কৃষক তো বাংলার চিত্রকলায় নতুন বিষয় নয়। গ্রামও নতুন নয়। নদী, গরু, ধান, লাঙল—এসবও নতুন নয়। নতুন ছিল ‘দেখার চোখ’।

যে কৃষককে অন্যের ছবিতে দরিদ্র, ক্লান্ত কিংবা প্রান্তিক মনে হতে পারে, সুলতানের ক্যানভাসে সেই কৃষকই হয়ে উঠল পৃথিবীর ভার বহনকারী এক মহাশক্তিমান মানুষ। এখানেই তাঁর শিল্পের সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ।

কিন্তু তার আগে সুলতানকে আবার ফিরে যেতে হয়েছিল নিজের মাটিতে। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তিনি আমেরিকা ও ইউরোপে ঘুরেছেন। নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, বোস্টন, শিকাগো, মিশিগানসহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁর ছবি প্রদর্শিত সম্পন্ন হয়েছে। ইংল্যান্ডেও গিয়েছেন। অথচ শেষ পর্যন্ত তাঁর মন টানল নড়াইলকে। ১৯৫৩ সালে চিত্রা নদীর ধারে একটি পরিত্যক্ত ভবনে বসতি গড়লেন। সঙ্গে ছিল নানা ধরনের পোষা প্রাণী। বাইরের শিল্পজগত থেকে ক্রমশ দূরে সরে গিয়ে প্রায় তেইশ বছর কাটালেন এই পরিবেশে। একজন শিল্পী পৃথিবী ঘুরে শেষ পর্যন্ত নিজের গ্রামের নদীর কাছে ফিরে এলেন—সুলতানের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক এইটিই। শুধু শিল্পে নয়, শিল্পী নিজেও ফিরে এসেছেন নদী আর মাটির কোলে। সম্ভবত এখানেই তাঁর শিল্পের আসল পরিবর্তন শুরু।

প্রথম জীবনে তিনি প্রকৃতি, নদী, গ্রামীণ জীবন—এসব আঁকতেন। তাঁর রেখা ছিল শক্তিশালী ও সংক্ষিপ্ত। তেলচিত্রে ভ্যান গঘ বা অন্য ইম্প্রেসনিস্টদের আঁকা ইমপাস্টো অর্থাৎ চড়া, ছাকা ছাকা রঙের চাপড়ের প্রভাব দেখা যেত তার ক্যানভাসেও। একসময় তাঁকে ল্যান্ডস্কেপ আর্টিস্ট হিসেবেও দেখা হতো। অর্থাৎ ছবিতে প্রকৃতিই ছিল মুখ্য, মানুষ ছিল অনেকটা তার অংশ। কিন্তু ধীরে ধীরে ছবির কেন্দ্র বদলে গেল। প্রকৃতি আর শুধু পটভূমি রইল না। মানুষ সামনে চলে এল। বিশেষ করে কৃষক। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫-এর মধ্যে তাঁর শিল্পে যে বড় পরিবর্তন দেখা যায়, সেটিই পরবর্তী সময়ে সুলতানের শিল্পের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। তাঁর কৃষকেরা অস্বাভাবিক রকম পেশিবহুল, শক্তিশালী।

কিন্তু কেন? তিনি কি বাস্তব কৃষকদের এমন দেখেছিলেন? অবশ্যই প্রশ্নটি সেখানেই আটকে থাকে না। সুলতানের কাছে শরীর ছিল একটি ‘ভাষা’। কৃষকের পেশি মানে কেবল পেশি নয়। তা শ্রমের প্রতীক। শক্তির প্রতীক। উৎপাদনের প্রতীক। মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রতীক। তিনি এমন সময়ে এমন কৃষক আঁকলেন, যখন কৃষককে শিল্পে প্রায়ই দারিদ্র্য, দুর্বলতা, ক্ষুধা কিংবা করুণার দৃষ্টিতে দেখা হতো। সুলতান সেই দৃষ্টিটাই উল্টে দিলেন। তাঁর কৃষক দুর্বল নয়। সে শক্তিশালী। সে মাথা নিচু করে দয়া চায় না। সে মাটির সঙ্গে লড়াই করে। উইলিয়াম ব্ল্যাকও পেশীবহুল মানুষ এঁকেছিলেন। কিন্তু তারা ছিল স্বয়ং আদম, কখনোবা দেবতুল্য চরিত্র, কখনো পৌরাণিক, কখনো বাইবেলের চরিত্র কখনোবা নিউটনের মতো নামকরা বিজ্ঞানী। কিন্তু সুলতানের পেশীবহুল মানুষ হলেন কৃষক, মজুর, মাঝি এমনকি জেলে বৌ, কৃষকের বৌ-ঝিয়েরা। সুলতানের দৃষ্টিভঙ্গিতে, মানুষের পেশি মাটির সঙ্গে সংগ্রামে ব্যবহৃত হয়; সেই বাহুর শক্তি লাঙলকে মাটির মধ্যে চালায়, ফসল উৎপন্ন করে। তাঁর ছবির কৃষকেরা তাই শক্তির প্রতীক।

এই জায়গায় সুলতানের শিল্পকে একটু অন্যভাবে দেখা যায়। তিনি আসলে কৃষকের ‘মর্যাদার ছবি’ আঁকছিলেন। কৃষক এখানে ছবির প্রান্তে নেই। সে ছবির কেন্দ্র। লাঙল শুধু একটি কৃষি-যন্ত্র নয়। তা যেন এক ধরনের অস্ত্র—তবে ধ্বংসের জন্য নয়, জীবন তৈরির জন্য। মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে যে মানুষ খাদ্য উৎপন্ন করে, তার শরীরেও তো যুদ্ধের শক্তি থাকা উচিত। সুলতানের কৃষকেরা তাই নায়ক। তাঁদের শরীর বাস্তবের শরীর নয় ‘ভাবনার শরীর’।

এ কারণেই তাঁর বিশাল পেশিগুলোকে শুধু ‘অতিরঞ্জিত’ বললে আসল ব্যাপারটি ধরা পড়ে না। এই exaggeration-এর মধ্যেই আছে তাঁর শিল্পের দর্শন। তিনি মানুষকে বড় করে আঁকেছেন, কারণ তাঁর চোখে মানুষের শ্রম বড়।

১৯৭৬ সালে ঢাকায় তাঁর প্রথম বড় একক প্রদর্শনী হয়। এই সময় থেকে তাঁর শিল্প নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ঢাকার Goethe-Institut আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ retrospective তাঁর শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠাকে আরো শক্তিশালী করে।

অর্থাৎ যে শিল্পী জীবনের একটা বড় সময় নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ালেন, নড়াইলের নদীর ধারে থাকলেন, শিল্পের মূলধারার বাইরে রইলেন—তাঁকেই শেষ পর্যন্ত শিল্পের মূলধারাকে স্বীকার করতে হলো। তবে সুলতান নিজে যেন কখনো সেই মূলধারার খুব একটা পরোয়া করেননি।

আধুনিক প্রযুক্তি তাঁর ছবিতে প্রায় অনুপস্থিত। বিমূর্ত চিত্রকলার প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না। তাঁর শিল্পের আধুনিকতা অন্য জায়গায়—তিনি আধুনিক শিল্পের ভাষা ধার করে নিজেকে আধুনিক করেননি; বরং নিজের মানুষ, নিজের মাটি, নিজের লোকজ জীবনকে কেন্দ্র করে নিজের ভাষা তৈরি করেছেন। এই কারণেই সুলতানের ছবি দেখতে শিল্পতত্ত্ব জানা জরুরি নয়। একজন সাধারণ মানুষও তাঁর ছবি দেখে থমকে দাঁড়াতে পারেন। কারণ তাঁর ছবির মানুষের শরীর আমাদের সঙ্গে কথা বলে। সেই কথা খুব সহজ, “আমরা আছি বলেই তোমরা আছ।”

কৃষক, শ্রমিক, মাটি—এই তিনটি জিনিসকে সুলতান যেন একটি বিশাল বৃত্তের মধ্যে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবন শুধু ছবি আঁকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিশু-কিশোরদের শিল্পশিক্ষার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। ১৯৬৯ সালে নড়াইলে কুরিগ্রাম ফাইন আর্টস ইনস্টিটিউট এবং ১৯৭৩ সালে যশোরে আরেকটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে চারুপীঠ নামে পরিচিত হয়। আর তাঁকে নিয়ে তৈরি সম্পন্ন হয়েছে তারেক মাসুদের বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘আদমসুরত’ (The Inner Strength)। ১৯৮২ সালে এর শুটিং শুরু হয়। সুলতানের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে কাজ করেছিলেন তারেক মাসুদ। ছবিটির নামই যেন সুলতানের শিল্পের একটি চাবিকাঠি—‘ভেতরের শক্তি’।

সুলতানের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি জীবদ্দশায় যে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, তার তুলনায় তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শিল্পের গুরুত্ব যেন আরো বিস্তৃত সম্পন্ন হয়েছে। তিনি মারা যান ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর। কিন্তু তাঁর ছবির যাত্রা থামেনি। আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন ১৯৭৮ সাল থেকে সুলতানের অসংখ্য ছবি তুলেছিলেন। সেসব ছবির মধ্য থেকে ৬৮টি নিয়ে ২০০৫ সালে প্রকাশ করেন ‘গুরু’। তাঁর নামে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চালু করেছে ‘এস এম সুলতান গোল্ড মেডেল’, যা তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া হয়।

২০১৪ সালে ঢাকায় আয়োজিত Second Sight প্রদর্শনীতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আবারো দর্শকের সামনে আসে। এসব কাজের কয়েকটি রয়েছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এবং এর চেয়ারম্যান আবুল খায়েরের সংগ্রহে। এ যেন মৃত্যুর পরেও এক শিল্পীর ফিরে আসা। যে মানুষটি নিজের ছবি সংরক্ষণ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না, তাঁর ছবিই পরে সংগ্রহশালা, প্রদর্শনী ও শিল্প-আলোচনার কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়।

সুলতানের জীবন তাই এক অদ্ভুত বৃত্তের মতো। নড়াইলের রাজমিস্ত্রির ঘর থেকে কলকাতা। কলকাতা থেকে ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত। সেখান থেকে লাহোর, করাচি। তারপর আমেরিকা, ইউরোপ। তারপর আবার নড়াইলের চিত্রা নদী। আর সেই নদীর ধারে বসেই যেন তিনি পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখতে শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর ছবিতে পৃথিবী এসে দাঁড়াল কৃষকের শরীরে, নদীর বাঁকে, ধানক্ষেতের বুকে, চরের জমিনে।

কৃষকের পেশিতে, মাটিতে, লাঙলে, হালের বলদে, ধানক্ষেতে, বীজে, অঙ্কুরিত ফসলে বাংলাদেশকে আঁকলেন একজন সুলতান। এই কারণেই এস এম সুলতানের ছবি শুধু ‘শিল্প’ নয়। এগুলো এক ধরনের ‘দৃষ্টিভঙ্গির বিপ্লব’। যে মানুষকে আমরা সাধারণত পেছনে রাখি, তাঁকে ক্যানভাসের কেন্দ্রে আনলেন তিনি। যে শ্রমকে আমরা চোখে দেখি না, তাকে দৃশ্যমান করলেন তিনি। যে কৃষককে আমরা দরিদ্রতার প্রতীক হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, তাকে শক্তির প্রতীকে পরিণত করলেন তিনি।

সম্ভবত এই কারণেই সুলতানের বিশালদেহী কৃষকেরা ছবির ফ্রেমের মধ্যে থেকেও পুরোপুরি স্থির মনে হয় না। তারা যেন একটু পরেই লাঙল তুলে মাঠে নেমে পড়বে, মাটি কাটবে, ধান বুনবে, ধান কাটবে। ফসল ফলানো মানুষগুলো শিল্পের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করবে, “আমাদের শরীরের শক্তি দিয়ে যে পৃথিবীটা দাঁড়িয়ে আছে, সেই পৃথিবীর ছবিতে আমরা এতদিন কোথায় ছিলাম?” এর উত্তর বাংলার শিল্পী সমাজের হয়ে ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন সুলতান।

কালীগঞ্জের আলোচিত ওসি জেল্লাল হোসেন প্রত্যাহার

ঢাকার বাইরে উন্নত চিকিৎসায় চীনের সহায়তায় ২০ হাসপাতাল

ঢাকার সড়কে আসছে বৈদ্যুতিক এসি বাস

একটি স্কাইরুট মিডিয়া লিমিটেডের প্রতিষ্ঠান

মার্কেটিং : +৮৮-০১৬৮৬৬৯৩৫৪৯ +৮৮-০১৬৮৬৬৯০২৬৬

Install for faster, offline access

Link copied!